রোদে গেলে ফ্রিকেলস বাড়ে কেন? সানস্ক্রিন কিংবা সুরক্ষামূলক পোশাক ছাড়াই যারা দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে কাজ করে তাদের অনেকেরই ত্বকে অনেক সময় ছোট ছোট বাদামী ছোপ ছোপ দাগ বা ফ্রিকেলস দেখা যায়। এগুলো সাধারণত মুখ, নাক, গাল বা কাঁধের অংশে বেশি দেখা যায় এবং অনেকের ক্ষেত্রে গাল ভরা ছোপ ছোপ কালচে খয়েরি দাগ আকারে প্রকাশ পায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এর মূল কারণ হলো মেলানিন; যা প্রাকৃতিকভাবে আমাদের ত্বকের রঙ নির্ধারণ করে । যখন আমাদের ত্বকে সূর্যের আলোর স্পর্শ লাগে তখন সূর্যের আলট্রাভায়োলেট ‘এ’ ও ‘বি’ (UV-A ও UV-B) রশ্মি ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে মেলানোসাইট কোষকে উদ্দীপিত করে। এর ফলে ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন তৈরি হয়, যা ফ্রিকেলসকে আরও গাঢ় করে তোলে। একই সাথে ত্বক রোদে পোড়ে শুষ্ক হয়ে যায় এবং ব্রণ, র্যাশ, ট্যান বা পিগমেন্টেশন এর মতো সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে।
বিস্তারিত জানুনঃ ফ্রিকেলস হওয়ার অনান্য কারণসমূহ? ফ্রিকেলস দূর করার কার্যকরী উপায়
রোদে গেলে ফ্রিকেলস বাড়ে কেন?
সূর্যের UV রশ্মির প্রভাব
সূর্যের আলোতে থাকা আলট্রাভায়োলেট ‘এ’ ও ‘বি’ (UV-A এবং UV-B) রশ্মি আমাদের ত্বকের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
- মেলানোসাইট সক্রিয়করণ: আমাদের ত্বকের নিচের স্তরে মেলানোসাইট নামক বিশেষ কিছু কোষ থাকে। যখন সূর্যের UV রশ্মি ত্বকে আঘাত করে, তখন এই কোষগুলো ত্বকের ডিএনএ-কে সুরক্ষা দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
- অতিরিক্ত মেলানিন উৎপাদন : ত্বককে সুরক্ষা দিতে এই কোষগুলো দ্রুত মেলানিন তৈরি করে। যখন এই রঞ্জক পদার্থ নির্দিষ্ট স্থানে পুঞ্জীভূত হয়, তখনই ফ্রিকেলস তৈরি হয়।
মেলানিন জমে দাগ গাঢ় হওয়া
রোদে গেলে আগের হালকা দাগগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, সূর্যের তাপে মেলানিন গাঢ়তর হয় এবং ত্বকের উপরিভাগে ক্লাস্টার বা বিন্দু আকারে জমে থাকে, যা কালচে খয়েরি ছোপ হিসেবে দৃশ্যমান হয়।
জেনেটিক কারণ
ফ্রিকেলস বাড়ার ক্ষেত্রে আপনার জিনতত্ত্ব বা ডিএনএ-র বড় ভূমিকা রয়েছে।
- MC1R জিনের ভূমিকা: যাদের শরীরে MC1R নামক জিনের বিশেষ বিন্যাস থাকে, তাদের ত্বক রোদে গেলে অন্যান্যদের তুলনায় দ্রুত মেলানিন উৎপাদন করে।
- বংশগত প্রবণতা: যদি আপনার বাবা-মায়ের ত্বকে ফ্রিকেলস হওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে জেনেটিক কারণেই সূর্যের আলোর প্রতি আপনার ত্বক অনেক বেশি সংবেদনশীল হবে এবং অল্প রোদেও দাগ বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।
সংবেদনশীল বা ফর্সা ত্বক
ত্বকের রঙের ওপর ভিত্তি করে UV রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন হয়।
- প্রাকৃতিক সুরক্ষার অভাব: ফর্সা ত্বকে প্রাকৃতিক মেলানিনের পরিমাণ কম থাকে, যা সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি প্রতিরোধে বাধা দেয়। ফলে UV রশ্মি সরাসরি কোষের ক্ষতি করতে পারে।
- সংবেদনশীলতা: ফর্সা বা সেনসিটিভ ত্বকে সূর্যালোক লাগলে মেলানোসাইটগুলো দ্রুত উদ্দীপিত হয়। এর ফলে এই ধরণের ত্বকে কেবল ফ্রিকেলস নয়, বরং ত্বকের লালচে ভাব, ট্যান এবং পিগমেন্টেশন হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি থাকে।
বিস্তারিত জানুনঃ How To Get Rid of Freckles
সানস্পটস (Sunspots) বনাম ফ্রিকেলস (Freckles) এর পার্থক্য
আমাদের ত্বকে যে সব বাদামী বা কালচে দাগ দেখা যায়, সেগুলোকে আমরা অনেক সময় এক ফেলি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই দুই ধরনের দাগের কারণ, গঠন এবং আচরণ আলাদা। তাই ত্বকের পিগমেন্টেশন চিকিৎসার ধরণ-ও আলাদা হয়।
১. ফ্রিকেলস (Freckles) বা এপিলিডস
ফ্রিকেলস হলো ত্বকের উপর ছোট ছোট বাদামী দাগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে এপিলিডস (Ephelides) বলা হয়। এটি সাধারণত ত্বকের স্বাভাবিক একটি বৈশিষ্ট্য এবং অনেক সময় জেনেটিক বা বংশগত কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
উৎপত্তি: ত্বকের রঙ নির্ধারণকারী একটি প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থ মেলানিন তখনই তৈরী হয় যখন ত্বকের মেলানোসাইট কোষ সূর্যের আলট্রাভায়োলেট (UV) রশ্মির প্রভাবে বেশি প্রভাবিত হয় এবং এর ফলে ফ্রিকেলস তৈরি হয়। সূর্যের আলো বেশি পেলে ত্বকের কিছু অংশে এই মেলানিন জমে ছোট ছোট দাগ তৈরি হয়।
আকার ও রঙ: ফ্রিকেলস সাধারণত আকারে ছোট হয়, প্রায় ১–২ মিলিমিটার। এগুলো সমতল থাকে এবং রঙ সাধারণত হালকা বাদামী বা খয়েরি হয়। মূলত শরীরের খোলা অংশ যেমন: মুখ, নাক, গাল বা কাঁধে এগুলো বেশি দেখা যায়।
পরিবর্তনশীলতা: ফ্রিকেলস মূলত সময় ও পরিবেশ অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। অর্থাৎ, গরমের সময় বা ত্বক সূর্যের আলোর সংস্পর্শ বেশি পেলে ত্বক থাকা দাগগুলো গাঢ় হয়ে যায়। আবার শীতকালে বা ত্বকে রোদ কম পেলে অনেক সময় এগুলো হালকা হয়ে যেতে পারে।
বয়স: ফ্রিকেলস সাধারণত শৈশব বা কৈশোরে প্রথম দেখা দেয়। বিশেষ করে যাদের ত্বক ফর্সা বা সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।
২. সানস্পটস (Sunspots) বা সোলার লেনটিজাইনস
সানস্পটস হলো সূর্যের আলোতে দীর্ঘদিন থাকার ফলে ত্বকে তৈরি হওয়া একটি স্থায়ী দাগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে সোলার লেনটিজাইনস (Solar Lentigines) বলা হয়। অনেক সময় এগুলোকে এজ স্পটও (Age Spot) বলা হয়।
উৎপত্তি: সানস্পটস সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী সূর্যরশ্মির ক্ষতি (photoaging) এর কারণে তৈরি হয়। বছরের পর বছর রোদে থাকার ফলে ত্বকের কোষে ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন হয়, তার ফল হিসেবে এই দাগগুলো দেখা দেয়।
আকার ও রঙ: সানস্পটস সাধারণত ফ্রিকেলসের তুলনায় বড় হয়। অনেক সময় এগুলোর আকার কয়েক মিলিমিটার থেকে ১–২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। রঙ তুলনামূলকভাবে গাঢ় বাদামী এবং দাগের সীমানা সাধারণত স্পষ্ট থাকে।
স্থায়িত্ব: ফ্রিকেলসের মতো সানস্পটস সহজে পরিবর্তন হয় না। একবার তৈরি হলে এগুলো সাধারণত স্থায়ীভাবে ত্বকে থেকে যায়। রোদ কম থাকলেও এগুলো নিজে থেকে মিলিয়ে যায় না।
বয়স: সানস্পটস সাধারণত ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সে বেশি দেখা যায়। কারণ এটি দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলোতে থাকার ফলে ত্বকে জমে থাকা ক্ষতির ফল।
ফ্রিকেলস সাধারণত ছোট এবং রোদে গাঢ় হলেও সময়ের সাথে সাথে হালকা হতে পারে। অন্যদিকে সানস্পটস সাধারণত বড়, গাঢ় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থায়ী হয়। তাই ফ্রিকেলস এবং সানস্পটস স্থায়ীভাবে কমানোর জন্য প্রথমত এবং স্কিন বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ গ্রহণ করা উত্তম হবে।
রোদে গেলে ফ্রিকেলস প্রতিরোধের উপায়
রোদে গেলে ফ্রিকেলস পুরোপুরি বন্ধ করা সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে, বিশেষ করে যদি এটি বংশগত কারণে হয়। তবে কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে ফ্রিকেলস হওয়া বা দাগ গাঢ় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার
ফ্রিকেলস প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হলো নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা। সাধারণত SPF 30 বা তার বেশি সানস্ক্রিন ত্বককে সূর্যের আলট্রাভায়োলেট (UV-A ও UV-B) রশ্মি থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। তাই বাইরে যাওয়ার প্রায় ১৫–২০ মিনিট আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো।
সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা
দিনের কিছু সময় সূর্যের আলো বেশি তীব্র থাকে। সাধারণত সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত রোদ সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়। এই সময় সম্ভব হলে সরাসরি রোদে বেশি সময় না থাকা ভালো। এতে ত্বকের ক্ষতি কম হয় এবং ফ্রিকেলস বাড়ার সম্ভাবনাও কমে।
ত্বক ঢেকে রাখা
রোদে বের হলে ত্বককে টুপি, ছাতা, সানগ্লাস বা লম্বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখলে সূর্যের আলো সরাসরি ত্বকে কম পড়ে। এতে ত্বক অনেকটা সুরক্ষিত থাকে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট স্কিন কেয়ার
ত্বকের কোষকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভূমিকা অপরিসীম।
- ভিটামিন C সিরাম: প্রতিদিন সকালে সানস্ক্রিন লাগানোর আগে ভিটামিন C সিরাম ব্যবহার করুন। এটি সূর্যের কারণে হওয়া অক্সিডেটিভ ড্যামেজ কমায় এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে পিগমেন্টেশন প্রতিরোধ করে।
পুষ্টিকর খাবার ও ডায়েট গ্রহণ করা
কেবল বাহ্যিক যত্ন নয়, ত্বককে ভেতর থেকে সুরক্ষিত রাখতে নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদান অপরিহার্য। ত্বকের কোষ পুনর্গঠন এবং মেলানিন নিয়ন্ত্রণ করতে আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২ এবং ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করুন। যেমন:
- ভিটামিন সি: লেবু, আমলকী ও টক জাতীয় ফল (যা কোলাজেন বাড়ায়)।
- ভিটামিন বি১২ ও ডি: ডিম, দুধ ও চর্বিযুক্ত মাছ।
- ফলিক অ্যাসিড: গাঢ় সবুজ শাকসবজি ও ডাল। এই খাবারগুলো সূর্যের কারণে হওয়া ত্বকের কোষের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং নতুন ফ্রিকেলস পড়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।
ফ্রিকেলস কমানোর চিকিৎসা
ফ্রিকেলস প্রতিরোধের উপায় যথাযথভাবে মেনে চলার পরেও যদি ত্বকের কালচে দাগ না কমে সেক্ষেত্রে অবশ্যই একজন স্কিন বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ গ্রহণ করা উচিৎ। যেহেতু সবার ত্বক একরকম হয় না; সেক্ষেত্রে
- লেজার ট্রিটমেন্ট (Laser Treatment): লেজার ট্রিটমেন্ট বর্তমানে ফ্রিকেলস কমানোর একটি পরিচিত পদ্ধতি। এই চিকিৎসায় বিশেষ ধরনের লেজার আলো ত্বকের সেই অংশে কাজ করে যেখানে অতিরিক্ত মেলানিন জমে থাকে। ধীরে ধীরে দাগ হালকা হয়ে যেতে পারে এবং ত্বকের রঙ তুলনামূলকভাবে সমান দেখায়। বিস্তারিত জানুন: Best Laser Treatment In Bangladesh: An Affordable Price.
- কেমিক্যাল পিল (Chemical Peel): কেমিক্যাল পিল চিকিৎসায় ত্বকের উপরিভাগে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এটি ত্বকের মৃত কোষ ধীরে ধীরে সরিয়ে দেয় এবং নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করে। ফলে সময়ের সঙ্গে ফ্রিকেলস কিছুটা হালকা হতে পারে।
- ক্রায়োথেরাপি (Cryotherapy): এই চিকিৎসায় একজন স্কিন বিশেষজ্ঞ একটি বিশেষ যন্ত্র (যেমন- ক্রায়োপেন) অথবা তরল নাইট্রোজেন স্প্রে সরাসরি দাগযুক্ত স্থানের ওপর প্রয়োগ করেন।
এই তরল নাইট্রোজেন অতিরিক্ত পিগমেন্টেশন যুক্ত কোষগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে জমিয়ে (Freeze) ফেলে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ও কালচে কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং কয়েকদিনের মধ্যে সেই স্থানে নতুন ও স্বাস্থ্যকর ত্বক তৈরি হতে শুরু করে।
উপসংহার
ফ্রিকেলস ত্বকের কোন ক্ষতি না করলেও কারও কারও সৌর্ন্দযে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠে। নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ সিরাম এবং সঠিক পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যমে এই দাগগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে যদি দাগগুলো প্রকট হয়ে গাল ভরা ছোপ ছোপ কালচে খয়েরি দাগ আকারে প্রকাশ পায়, তবে আধুনিক লেজার বা ক্রায়োথেরাপির মতো চিকিৎসা গ্রহণ করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
ত্বকের যেকোনো পরিবর্তনের জন্য একজন অভিজ্ঞ ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ নিন এবং আপনার ত্বকের ধরণ অনুযায়ী সঠিক যত্ন নিশ্চিত করুন।