খুশকি দূর করার ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক উপায় এবং শ্যাম্পু ব্যবহারের সঠিক নিয়ম
খুশকি দূর করার ঘরোয়া উপায়-এর পাশাপাশি এই ব্লগে আমরা আলোচনা করেছি খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক উপায়, শ্যাম্পু ব্যবহারের সঠিক নিয়ম এবং খুশকি কমাতে কোন কোন অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। এছাড়া মাথায় খুশকি হলে চুল পড়তে পারে কি না, সে বিষয়েও জানব। তবে তার আগে জেনে নেওয়া যাক, খুশকি কী এবং কেন হয়।
খুশকি হলো মাথার ত্বকের একটি সাধারণ সমস্যা, যেখানে ত্বকের উপরের স্তরে মৃত কোষ সাদা আঁশের মতো ঝরে চুল ঘাড় ও কাঁধে পড়ে। খুশকি হলে প্রায়ই মাথা চুলকায়। এটি কোনো ছোঁয়াচে নয় এবং সাধারণত গুরুতর সমস্যাও তৈরি করে না। তবে দেখতে অস্বস্তিকর এবং চুলকানোর কারণে অনেকের আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে।
খুশকির প্রধান কারণ হলো মাথার ত্বকে স্বাভাবিকভাবে থাকা ম্যালাসেজিয়া নামের ছত্রাক। এছাড়া মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল জমা, নিয়মিত চুল না ধোয়া, শুষ্ক ত্বক, ঘাম ও ধুলাবালি এবং ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়াও খুশকি বাড়াতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন মানসিক চাপ ও পারিবারিক প্রবণতাও এর পেছনে ভূমিকা রাখে।
Table of Contents
ঘরে বসে খুশকি দূর করার ৪টি ঘরোয়া উপায়
ক) মাথার ত্বক পরিষ্কার রেখে খুশকি দূর করার উপায়
১. চুল ও মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা: চুল ও মাথার ত্বক সুস্থ ও পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত যত্ন নেওয়া জরুরি। নিচে চুল ও মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখার কার্যকর নিয়মগুলো দেওয়া হলো:
- শ্যাম্পু চুলের গোড়ায় ও মাথার ত্বকে লাগিয়ে আঙুলের ডগা দিয়ে ১ থেকে ২ মিনিট আলতো করে মালিশ করুন।
- নখ দিয়ে ঘষবেন না, এতে ত্বকে আঁচড় লেগে প্রদাহ বাড়ে।
- খুব গরম পানির বদলে কুসুম গরম বা সাধারণ পানি ব্যবহার করুন।
- খুশকি বেশি থাকলে জিংক পাইরিথিওন, কিটোকোনাজল বা সেলেনিয়াম সালফাইডযুক্ত অ্যান্টি-ডেনড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করা যায়। লেবেলের নির্দেশনা মেনে মাথায় ৩ থেকে ৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- খুশকি হয়েছে বলে চুল ধোয়া কমিয়ে দেবেন না। অনেক দিন না ধুলে তেল ও মৃত কোষ জমে খুশকি আরও বাড়ে।
২. ঘাম ও ধুলাবালির পর চুল পরিষ্কার করা: ঘাম ও ধুলাবালি মাথার ত্বকে তেলের সঙ্গে মিশে চটচটে স্তর তৈরি করে, যা ত্বকে চুলকানি ও খুশকি বাড়ায়। গরমের দিনে বা বাইরে বেশি সময় কাটালে এই সমস্যা বেশি হয়। ঘাম ও ধুলাবালি থেকে চুল ও স্ক্যাল্প (মাথার ত্বক) পরিষ্কার রাখার সহজ ও কার্যকর কিছু নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:
- বেশি ঘাম হলে বা ধুলাবালিতে অনেকক্ষণ থাকলে বাড়ি ফিরে সেদিনই মাথা ধুয়ে নিন।
- ব্যায়াম বা খেলাধুলার পর ঘাম শুকিয়ে ত্বকে বসে যেতে দেবেন না।
- সম্ভব হলে পরিষ্কার নরম কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে আলতো করে ঘাম মুছে নিন।
- দিনের শেষে শোয়ার আগে ঘাম ও ময়লা নিয়ে ঘুমানো এড়িয়ে চলুন।
- ঘামযুক্ত চুল শক্ত করে বেঁধে রাখবেন না। আগে চুল ও স্ক্যাল্প পুরোপুরি শুকাতে দিন।
৩. শ্যাম্পু করার পর ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা:
শ্যাম্পু করার পর চুল ও স্ক্যাল্প থেকে শ্যাম্পুর ফেনা ও ময়লা সম্পূর্ণরূপে দূর করতে ১-২ মিনিট বা তার বেশি সময় নিয়ে ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলেন। ঘন বা লম্বা চুলের ক্ষেত্রে আরও একটু সময় নিয়ে পরিষ্কার করুন। নিচে আরও কিছু নিয়ম তুলে ধরা হলো:
- ফেনা পুরোপুরি না যাওয়া পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানিতে মাথা ধুয়ে নিন।
- কানের পেছন, ঘাড় ও চুলের গোড়ার দিকে বিশেষ নজর দিন কারণ এসব জায়গায় ফেনা বেশি থেকে যায়।
- কন্ডিশনার শুধু চুলের মাঝামাঝি থেকে ডগা পর্যন্ত লাগান, মাথার ত্বকে নয়।
- ধোয়ার পর তোয়ালে দিয়ে ঘষার বদলে আলতো করে চেপে পানি শুষে নিন এবং ভেজা চুল বেঁধে বা টুপি পরে বেশিক্ষণ রাখবেন না।
৪. বালিশের কভার ও টুপি বা হেলমেট নিয়মিত পরিষ্কার করা
বালিশের কভার, টুপি এবং হেলমেট সরাসরি আমাদের ত্বক ও চুলের সংস্পর্শে আসে। তাই এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখা ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। নোংরা কভার বা হেলমেট ব্যবহার করলে ব্রণ, খুশকি, চুল পড়া এবং ত্বকের অ্যালার্জি হতে পারে। নিচে এগুলো নিয়মিত ও সঠিকভাবে পরিষ্কার রাখার সহজ উপায় দেওয়া হলো:
১. বালিশের কভার পরিষ্কার রাখা: বালিশের কভারে আমাদের ত্বকের তেল, ঘাম, ডেড স্কিন সেল (মৃত কোষ) এবং চুলে ব্যবহৃত নানা পণ্য বা ময়লা লেগে থাকে।
- ধোয়ার নিয়ম: প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১ থেকে ২ বার বালিশের কভার পরিবর্তন করে ধুয়ে ফেলুন।
- পদ্ধতি: কুসুম গরম পানি ও ভালো ডিটারজেন্ট দিয়ে কভার ধুয়ে নিন। রোদে ভালো করে শুকিয়ে নিলে সব জীবাণু দূর হয়ে যায়।
- সতর্কতা: সুতি বা সিল্কের কভার ব্যবহার করলে ত্বকের ঘর্ষণ কম হয় এবং ব্যাকটেরিয়া কম জমে।
২. টুপি পরিষ্কার রাখা: ধুলোবালি এবং মাথার ঘামের কারণে টুপি দ্রুত নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়।
- ধোয়ার নিয়ম: ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে মাসে ১ থেকে ২ বার টুপি ধোয়া উচিত।
- পদ্ধতি: টুপির শেইপ বা আকৃতি ঠিক রাখতে ওয়াশিং মেশিনে না দিয়ে হাতে ধোয়া ভালো। একটি বালতিতে কুসুম গরম পানি ও মৃদু ডিটারজেন্ট বা শ্যাম্পু মিশিয়ে টুপিটি ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এরপর নরম ব্রাশ বা হাত দিয়ে ঘষে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- শুকানো: টুপিটি মোচড়ানো যাবে না। একটি শুকনো তোয়ালে দিয়ে বাড়তি পানি চেপে নিয়ে বাতাসে বা ছায়ায় শুকিয়ে নিন।
৩. হেলমেট পরিষ্কার রাখা: হেলমেটের ভেতরে ঘাম জমে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস তৈরি হয়, যা খুশকি ও চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
- ভেতরের প্যাডিং: হেলমেটের ভেতরের ফোম বা প্যাডিং যদি খুলে ফেলা যায় (Detachable), তবে তা খুলে সপ্তাহে বা দুই সপ্তাহে একবার মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিন।
- স্থায়ী প্যাডিং: প্যাডিং যদি খোলা না যায়, তবে হেলমেট ক্লিনার স্প্রে বা ইকুয়াল পার্টস পানি ও ভিনেগার মিশিয়ে ভেতরে স্প্রে করুন এবং মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে মুছে বাতাসে শুকিয়ে নিন।
- বাইরের অংশ: হেলমেটের বাইরের গ্লাস এবং বডি পরিষ্কার পানি ও নরম কাপড় দিয়ে নিয়মিত মুছুন, যাতে স্ক্র্যাচ না পড়ে।
৫. নিয়মিত চিরুনি পরিষ্কার রাখা: চিরুনিতে মাথার তেল, মৃত কোষ ও ময়লা জমে থাকে। অপরিষ্কার চিরুনি দিয়ে আঁচড়ালে সেই ময়লা আবার পরিষ্কার মাথায় ফিরে যায়। তাই নিয়মিত চিরুনি পরিষ্কার রাখা চুল ও স্ক্যাল্পের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
- সপ্তাহে অন্তত একবার চিরুনি ও ব্রাশ থেকে চুল ও জমে থাকা ময়লা তুলে ফেলুন।
- হালকা শ্যাম্পু মেশানো কুসুম গরম পানিতে ৫ থেকে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে পুরোনো টুথব্রাশ দিয়ে হালকা ঘষে ধুয়ে নিন।
- ভালো করে শুকিয়ে ব্যবহার করুন।
- অন্যের চিরুনি ব্যবহার করবেন না এবং নিজেরটিও কাউকে দেবেন না।
খ) খুশকি দূর করতে চুল ও মাথার ত্বকের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু নির্বাচন ও ব্যবহার
চুলের ধরন ও মাথার ত্বকের সমস্যার ওপর নির্ভর করে শ্যাম্পু নির্বাচন করা উচিত। সঠিক শ্যাম্পু মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখতে, চুলের শুষ্কতা কমাতে এবং খুশকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। নিচে বিভিন্ন ধরনের চুল ও স্ক্যাল্পের জন্য উপযুক্ত শ্যাম্পু এবং উপকারী উপাদান তুলে ধরা হলো।
১. শুষ্ক চুল ও শুষ্ক স্ক্যাল্প (Dry Hair and Scalp)
- সমস্যা: চুল রুক্ষ হয়ে যাওয়া, চুলের আগা ফেটে যাওয়া এবং মাথার ত্বকে শুষ্কতা বা টান অনুভব করা।
- শ্যাম্পুর ধরন: মৃদু ক্লিনজিং ও ময়েশ্চারাইজিং শ্যাম্পু।
- উপকারী উপাদান: গ্লিসারিন, প্যানথেনল, সিরামাইড ও অ্যালোভেরা। এসব উপাদান চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
২. তৈলাক্ত চুল ও স্ক্যাল্প (Oily Scalp)
- সমস্যা: মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল জমা, চুল দ্রুত চিটচিটে হয়ে যাওয়া এবং চুলে ময়লা জমার প্রবণতা।
- শ্যাম্পুর ধরন: তৈলাক্ত স্ক্যাল্প পরিষ্কারের উপযোগী মৃদু ক্লিনজিং শ্যাম্পু।
- উপকারী উপাদান: স্যালিসিলিক অ্যাসিড তৈলাক্ত স্ক্যাল্পে জমে থাকা মৃত কোষ অপসারণে সাহায্য করতে পারে। তবে অতিরিক্ত ব্যবহারে শুষ্কতা বা জ্বালাপোড়া হতে পারে।
৩. স্বাভাবিক চুল ও স্ক্যাল্প (Normal Hair and Scalp)
- সমস্যা: মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল বা শুষ্কতা নেই, তবে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন।
- শ্যাম্পুর ধরন: চুল ও স্ক্যাল্পের উপযোগী মৃদু, দৈনন্দিন ব্যবহারের শ্যাম্পু।
- উপকারী উপাদান: প্যানথেনল ও গ্লিসারিন চুলের কোমলতা এবং আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ কোনো সমস্যা না থাকলে ঔষধযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।
৪. কোঁকড়া বা ওয়েভি চুল (Curly or Wavy Hair)
- সমস্যা: চুল সহজে জট বেঁধে যাওয়া, রুক্ষ হয়ে পড়া এবং আর্দ্রতার অভাবে চুলের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হওয়া।
- শ্যাম্পুর ধরন: ময়েশ্চারাইজিং ও মৃদু ক্লিনজিং শ্যাম্পু।
- উপকারী উপাদান: গ্লিসারিন, প্যানথেনল এবং উপযুক্ত কন্ডিশনিং উপাদান চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে ও জট কমাতে সাহায্য করতে পারে। শ্যাম্পু মূলত মাথার ত্বকে ব্যবহার করুন এবং চুলের দৈর্ঘ্যে অতিরিক্ত ঘষাঘষি এড়িয়ে চলুন।
৫. পাতলা ও দুর্বল চুল (Fine or Thin Hair)
- সমস্যা: চুল সহজে বসে যাওয়া, ভলিউম কম দেখানো এবং অতিরিক্ত ভারী পণ্য ব্যবহারে চুল চিটচিটে হয়ে যাওয়া।
- শ্যাম্পুর ধরন: হালকা, ভলিউম বাড়াতে সহায়ক শ্যাম্পু।
- উপকারী উপাদান: প্যানথেনল ও হালকা কন্ডিশনিং উপাদান চুলকে সাময়িকভাবে ঘন দেখাতে এবং চুলের ব্যবস্থাপনা সহজ করতে সাহায্য করতে পারে। চুল পড়া বা পাতলা হওয়ার প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে শুধু শ্যাম্পুর ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
৬. খুশকিযুক্ত স্ক্যাল্প (Dandruff-Prone Scalp)
খুশকিযুক্ত মাথার ত্বকে সাধারণত সাদা বা হলদেটে আঁশ, খোসা, চুলকানি এবং কখনো কখনো তৈলাক্ত স্তর দেখা যায়। এ ধরনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সাধারণ শ্যাম্পুর পরিবর্তে অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ বা খুশকিনাশক শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে। শ্যাম্পু নির্বাচনের ক্ষেত্রে এর কার্যকরী উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, কেটোকোনাজল (Ketoconazole) খুশকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট Malassezia ইস্টের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সেলেনিয়াম সালফাইড (Selenium Sulfide) খুশকি ও মাথার ত্বকের আঁশ কমাতে সহায়তা করতে পারে। স্যালিসিলিক অ্যাসিড (Salicylic Acid) মাথার ত্বকে জমে থাকা মৃত কোষ ও আঁশ অপসারণে সাহায্য করে।
খুশকি দূর করতে শ্যাম্পু ব্যবহারের সঠিক নিয়ম
খুশকি দূর করতে খুশকি-রোধী বা অ্যান্টি-ড্যান্ড্রাফ (Anti-dandruff) শ্যাম্পু সাধারণ শ্যাম্পুর মতো ব্যবহার করলে কাজ হয় না। এর কার্যকারিতা পেতে সঠিক নিয়ম মেনে ব্যবহার করা জরুরি:
- চুল ও স্ক্যাল্প ভালোমতো ভেজানো: শ্যাম্পু দেওয়ার আগে হালকা কুসুম গরম বা পরিষ্কার স্বাভাবিক তাপমাত্রা পানি দিয়ে সম্পূর্ণ চুল ও স্ক্যাল্প (মাথার ত্বক) ভালোভাবে ভিজিয়ে নিন।
- স্ক্যাল্পে ব্যবহার: শ্যাম্পু সরাসরি চুলে না লাগিয়ে প্রথমে হাতের তালুতে ঘষে একটু ফেনা করে নিন বা সরাসরি ভেজা স্ক্যাল্প বা চুলের গোড়ায় লাগান। বিশেষ করে যেখানে বেশি খুশকি বা চুলকানি রয়েছে।
- আঙুলের ডগা দিয়ে ম্যাসাজ: নখ দিয়ে কখনো স্ক্যাল্প না আঁচড়িয়ে; আঙুলের ডগা দিয়ে হালকাভাবে ৫ মিনিট ম্যাসাজ করুন যাতে স্ক্যাল্পের ভেতর শ্যাম্পু পৌঁছায়। এতে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং খুশকি হালকা হয়।
- অপেক্ষা করা: শ্যাম্পু লাগানোর পর সঙ্গে সঙ্গেই ধুয়ে ফেলবেন না। সক্রিয় উপাদান বা অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট (কিটোকোনাজোল, জিঙ্ক পাইরিথিওন, সেলেনিয়াম সালফাইড বা স্যালিসাইলিক অ্যাসিড) কাজ করার জন্য অন্তত ৩ থেকে ৫ মিনিট (অথবা ৫ থেকে ১০ মিনিট, শ্যাম্পুর নির্দেশনা অনুযায়ী) স্ক্যাল্পে লাগিয়ে রাখুন।
- ভালোভাবে ধুয়ে ফেলা: সময় হয়ে গেলে পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি দিয়ে চুল ও স্ক্যাল্প ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন যাতে কোনো শ্যাম্পু বা ফেনা লেগে না থাকে।
- কন্ডিশনার ব্যবহার: চুল ও স্ক্যাল্প অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়া ঠেকাতে শ্যাম্পু করার পর প্রয়োজন অনুযায়ী চুলের মাঝখান থেকে আগা পর্যন্ত (স্ক্যাল্প এড়িয়ে) ভালো মানের হালকা কন্ডিশনার ব্যবহার করতে পারেন। তবে তা যেন স্ক্যাল্পে না লেগে শুধু চুলের মাঝখান থেকে আগা পর্যন্ত হয়।
গ) খুশকি কমাতে দৈনন্দিন চুলের যত্ন নেওয়ার নিয়ম
খুশকি কমাতে শুধু শ্যাম্পু যথেষ্ট নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দৈনন্দিন যত্নের মূল নিয়ম হলো মাথার ত্বক পরিষ্কার ও আরামদায়ক রাখা, নখ দিয়ে চুলকানো এড়ানো, চুলে ভারী পণ্য ও অতিরিক্ত তাপ কমানো এবং খাবার, ঘুম ও মানসিক চাপের দিকেও নজর দেওয়া। এই অভ্যাসগুলো নিয়মিত মানলে খুশকি কমে এবং আবার ফিরে আসার ঝুঁকিও কমে।
খুশকি কমাতে সকালে চুলের যত্ন:
সকালে কয়েকটি সহজ অভ্যাস মানলে মাথার ত্বক সারাদিন পরিষ্কার ও আরামদায়ক থাকে। এতে খুশকি ও চুলকানি কমতে সাহায্য করে।
- আলতো করে চুল আঁচড়ান: পরিষ্কার চিরুনি বা নরম ব্রাশ দিয়ে চুলের গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত আস্তে আঁচড়ান। এতে চুলের আলগা আঁশ বা বিচ্ছিন্ন চুল সরে যায়, তবে জোরে টানবেন না।
- চুল শুকনো রেখে বের হোন: ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে চুলে বের হলে মাথার ত্বক আর্দ্র থাকে, যা খুশকি বাড়াতে পারে।
- নখ দিয়ে চুলকাবেন না: চুলকালে আঙুলের নরম ডগা দিয়ে আলতো চাপ দিন।
- অ্যালোভেরা জেল: সকালে গোসলের কিছু সময় আগে তাজা অ্যালোভেরা জেল সরাসরি স্ক্যাল্পে লাগিয়ে রাখুন, ১৫-২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলতে পারেন। এটি চুলকানি ও খুশকি কমাতে সাহায্য করে।
- ম্যাসাজ ও তেল ব্যবহার: সকালে গোসলের অন্তত ১ ঘণ্টা আগে হালকা গরম নারকেল তেল বা জলপাই তেলের সাথে কয়েক ফোঁটা টি-ট্রি অয়েল মিশিয়ে মাথার ত্বকে আলতো করে ম্যাসাজ করুন।
- রোদে বেরোনোর আগে মাথা ঢাকুন: বাইরে যাওয়ার সময় পরিষ্কার সুতির টুপি বা স্কার্ফ ব্যবহার করুন। কারণ তীব্র রোদ ও ঘামে মাথার ত্বকে অস্বস্তি হতে পারে।
- অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু: সকালে চুল ধোয়ার সময় জিঙ্ক পাইরিথিওন (Zinc Pyrithione), সেলেনিয়াম সালফাইড (Selenium Sulfide) বা কেটোকোনাজোল (Ketoconazole)যুক্ত অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন। শ্যাম্পু করার সময় ফেনা মাথায় ৩ থেকে ৫ মিনিট রেখে তারপর ধুয়ে ফেলুন।
খুশকি কমাতে রাতে ঘুমানোর আগে চুলের যত্ন:
- হালকা ম্যাসাজ: তেল বা অ্যালোভেরা লাগানোর পর আঙুলের ডগা দিয়ে ৫ মিনিট হালকাভাবে গোল গোল করে ম্যাসাজ করুন। এতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং উপাদানগুলো ভালোভাবে শোষিত হয়।
- মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা: ঘুমানোর আগে স্ক্যাল্প বা মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখুন। ঘাম বা তেল জমে থাকলে তা খুশকি বাড়িয়ে দেয়।
- চুল ভালোভাবে শুকানো: ভেজা চুল নিয়ে কখনোই ঘুমাতে যাবেন না। এতে ফাঙ্গাস বা খুশকির সংক্রমণ বাড়ে। ব্লো-ড্রায়ার ব্যবহার না করে প্রাকৃতিকভাবে শুকিয়ে নেওয়া ভালো।
- চুল জটমুক্ত করা: ঘুমানোর আগে মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে জট ছাড়িয়ে নিন। এতে চুল ভাঙা রোধ হয়।
- ঢিলেঢালা করে বাঁধা: চুল খোলা না রেখে আলগা করে বিনুনি (পনিটেল বা খোপা) করে ঘুমানো উচিত, যাতে চুলে জট না বাঁধে।
- সিল্ক বা সাটিনের বালিশের কভার: সুতির বদলে সিল্ক বা সাটিনের বালিশের কভার ব্যবহার করুন, যা চুল ঘষা খাওয়া ও ভেঙে যাওয়া কমায়
ঘ) খুশকি দূর করতে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
খুশকি দূর করতে এবং মাথার ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সঠিক পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস ও সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা ভেতর থেকে মাথার ত্বক বা স্ক্যাল্প সুস্থ রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। যদিও খাদ্যাভ্যাস সরাসরি খুশকির মূল কারণ (যেমন মালাসেসিয়া ছত্রাক) পুরোপুরি দূর করতে পারে না, তবে এটি মাথার ত্বকের প্রদাহ কমিয়ে এবং তেল নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে খুশকি প্রতিরোধে সাহায্য করে।
খুশকি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
- জিঙ্ক ও ভিটামিন বি সমৃদ্ধ খাবার: জিঙ্ক এবং ভিটামিন বি (বিশেষ করে বি৬ ও বায়োটিন) স্ক্যাল্পের কোষের অতিরিক্ত বৃদ্ধি এবং তেল উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে।
- খাদ্য উৎস: ডিম, বাদাম, কুমড়োর বীজ, সামুদ্রিক মাছ, মাংস, দুগ্ধজাত খাবার এবং গোটা শস্য (Whole grains)।
- ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: এটি ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং স্ক্যাল্পের প্রদাহ (inflammation) কমায়, যা খুশকি ও চুলকানি দূর করতে সাহায্য করে।
- খাদ্য উৎস: চর্বিযুক্ত মাছ (ইলিশ, রুই), তিসির তেল, আখরোট এবং চিয়া সিড।
- প্রোবায়োটিক যুক্ত খাবার: প্রোবায়োটিক অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, যা খুশকি সৃষ্টিকারী ফাঙ্গাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- খাদ্য উৎস: টক দই।
- চিনি ও রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট কমানো: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এবং প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা স্ক্যাল্পে তেলের (sebum) উৎপাদন বৃদ্ধি করে ফাঙ্গাসের বংশবৃদ্ধি ঘটায়।
২. জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
- পর্যাপ্ত পানি পান: শরীর ডিহাইড্রেটেড বা পানিশূন্য হয়ে পড়লে মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, যা খুশকির সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা জরুরি।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, যা খুশকির ফাঙ্গাসকে সহজে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।
- করণীয়: প্রতিদিন নিয়মিত মেডিটেশন, ইয়োগা বা পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- সঠিকভাবে চুল ও স্ক্যাল্পের যত্ন:
- চুল নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন যাতে স্ক্যাল্পে অতিরিক্ত তেল বা ময়লা জমতে না পারে।
- চুল ধোয়ার পর ভালোমতো শুকিয়ে নিন, কারণ ভেজা ও আর্দ্র স্ক্যাল্প ফাঙ্গাসের প্রিয় বাসস্থান।
- খুব বেশি গরম পানি দিয়ে মাথা ধোবেন না; এটি স্ক্যাল্পকে শুষ্ক করে ফেলে। কুসুম গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করুন।
- চুলের প্রসাধনী ব্যবহারে সতর্কতা: অতিরিক্ত হেয়ার জেল, স্প্রে বা কেমিক্যালযুক্ত স্টাইলিং প্রোডাক্ট ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। এগুলো স্ক্যাল্পে জমা হয়ে খুশকি সৃষ্টি করতে পারে।
- নিয়মিত চিরুনি ও তোয়ালে পরিষ্কার রাখা: অন্যের চিরুনি, তোয়ালে বা বালিশের কভার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন এবং নিজের ব্যবহৃত জিনিসগুলো নিয়মিত ধুয়ে পরিষ্কার রাখুন।
খুশকি দূর করার ৬টি প্রাকৃতিক উপায়
খুশকি মাথার ত্বকের একটি সাধারণ সমস্যা, যা ত্বকের তেল, মৃত কোষ ও Malassezia নামক ইস্টের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিছু প্রাকৃতিক উপাদান মাথার ত্বকের খুশকি বা অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। নিচে খুশকি দূর করার ৬টি কার্যকর প্রাকৃতিক উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. খুশকি কমাতে অ্যালোভেরা ব্যবহার
অ্যালোভেরায় রয়েছে অ্যান্টিফাঙ্গাল ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান যা খুশকি সৃষ্টিকারী ছত্রাক দূর করতে সাহায্য করে। খুশকি দূর করতে অ্যালোভেরার ব্যবহার ও সঠিক সময় নিচে দেওয়া হলো:
- তাজা জেল বা রস: অ্যালোভেরা পাতা থেকে তাজা জেল বা রস বের করে নিন।
- প্রয়োগ: চুল ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে সরাসরি স্ক্যাল্প বা মাথার ত্বকে ভালোমতো ম্যাসাজ করুন।
- সময়: স্ক্যাল্পে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর্যন্ত লাগিয়ে রাখুন।
- ধোয়া: সময় হয়ে গেলে শুধু সাধারণ পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন, চুল ধোয়ার পর শ্যাম্পু করে নিতে পারেন।
- অন্য উপাদানের ব্যবহার: ভালো ফল পেতে অ্যালোভেরা জেলের সাথে সামান্য নারকেল তেল মিশিয়ে চুলে লাগাতে পারেন।
কতদিন ব্যবহার করবেন: সপ্তাহে অন্তত ২-৩ বার এটি ব্যবহার করতে পারেন।
২. খুশকির জন্য নারকেল তেল ব্যবহার
নারকেল তেল মাথার ত্বকের শুষ্কতা দূর করে এবং হালকা ছত্রাকের বৃদ্ধি কমিয়ে খুশকি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। খুশকি দূর করতে নারকেল তেলের ব্যবহার ও সঠিক সময় নিচে দেওয়া হলো:
- পরিমাণ: ২ থেকে ৩ টেবিল চামচ নারকেল তেল (চুলের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী কম-বেশি করতে পারেন)।
- প্রয়োগ: হালকা গরম করে বা স্বাভাবিক অবস্থায় মাথার ত্বকে (স্ক্যাল্পে) আঙুল দিয়ে ভালো করে মালিশ করুন।
- সময়: চুলে তেল লাগিয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট রেখে দিন।
- অন্য উপাদানের ব্যবহার: ২ টেবিল চামচ নারকেল তেলের সাথে আধা চা চামচ বা কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে লাগাতে পারেন।
- ধোয়া: সময় হয়ে গেলে একটি মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে চুল ও স্ক্যাল্প ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। শ্যাম্পু ব্যবহারের পর কন্ডিশনার ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
কতদিন ব্যবহার করবেন: সপ্তাহে ১-২ দিন তবে খুশকি কমে গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মাঝে মাঝে এটি ব্যবহার করতে পারেন।
৩. আপেল সাইডার ভিনেগার ব্যবহার
আপেল সাইডার ভিনেগার মাথার খুশকি, স্ক্যাল্পের ছত্রাক, চুলকানি ও চুলের রুক্ষ ভাব দূর করতে সাহায্য করে।
- প্রয়োগ: প্রথমে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ভালো করে ধুয়ে নিন। এরপর হালকা ভেজা চুলেই মিশ্রণটি লাগান।
- পরিমাণ: ৩ টেবিল চামচ আপেল সাইডার ভিনেগারের সাথে ১ কাপ (বা পর্যাপ্ত পরিমাণে) সাধারণ পানি মিশিয়ে নিন। চাইলে এর সাথে সামান্য অ্যালোভেরা জেল মেশাতে পারেন।
- সময়: চুলে বা স্ক্যাল্পে লাগিয়ে ৫ থেকে ৭ মিনিট অপেক্ষা করুন।
- ধোয়া: সময় হয়ে গেলে সাধারণ বা হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে চুল ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
কতদিন ব্যবহার করবেন: সপ্তাহে ১ থেকে ২ বার এর বেশি চুলে বা ত্বকে ব্যবহার করা উচিত নয়। সরাসরি বা নিয়মিত প্রতিদিন ব্যবহারে স্ক্যাল্প বা ত্বক রুক্ষ হয়ে যেতে পারে।
৪. মেথি ভেজানো পানি ব্যবহার
খুশকি দূর করতে মেথি ভেজানো পানি মাথার ত্বকের খুশকি কমাতে, চুল পড়া রোধ ও চুলের গোড়া শক্ত করতে সাহায্য করে।
- প্রয়োগ: শ্যাম্পু করার পর চুল ভালো করে ধুয়ে নিন। এরপর ভেজা চুলে বা স্ক্যাল্পে মেথি ভেজানো পানি শেষ রিন্স (Hair rinse) হিসেবে ঢেলে আলতোভাবে ম্যাসাজ করুন।
- সময়: চুলে মেথি পানি দেওয়ার পর ধুয়ে ফেলার দরকার নেই, অথবা ৫-১০ মিনিট রেখে সাধারণ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে পারেন।
- অন্য উপাদানের ব্যবহার: মেথি বেটে তার সাথে ২ চামচ অ্যালোভেরা জেল ও ১ চামচ টক দই মিশিয়ে স্ক্যাল্পে ৩০-৪৫ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করা যায়।
কতদিন ব্যবহার করবেন: ভালো ফলাফলের জন্য সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার এই পানি ব্যবহার করতে পারেন।
৫. খুশকি কমাতে আমলকী ব্যবহার
খুশকি দূর করতে আমলকি অত্যন্ত কার্যকর একটি প্রাকৃতিক উপাদান। এটি মাথার ত্বকের অতিরিক্ত তেল ও খুশকির সংক্রমণ কমায় এবং চুলকে সুস্থ রাখে।
- উপকরণ: ২ চা চামচ আমলকি গুঁড়া (অথবা তাজা আমলকির রস), ২ চা চামচ টক দই এবং ১ চামচ মধু বা নারকেল তেল।
- প্রয়োগ: সব উপকরণ ভালোমতো মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করুন। এবার চুলের গোড়া ও স্ক্যাল্পে ভালোভাবে লাগিয়ে ৫–৭ মিনিট হালকা হাতে ম্যাসাজ করুন।
কতদিন ব্যবহার করবেন: খুশকি নিয়ন্ত্রণে সপ্তাহে ২ দিন এই প্যাকটি ব্যবহার করুন।
৬. খুশকি কমাতে টক দই ব্যবহার
টক দই মাথার ত্বকের পিএইচ (pH) ভারসাম্য রক্ষা করে এবং খুশকি সৃষ্টিকারী ছত্রাক ধ্বংস করতে সহায়তা করে। খুশকি দূর করতে টক দইয়ের ব্যবহার নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
- সরাসরি ব্যবহার: সাধারণ বা হালকা ঠান্ডা টক দই সরাসরি স্ক্যাল্পে ও চুলের গোড়ায় ভালোমতো লাগিয়ে নিন।
- সময়: চুলে ও স্ক্যাল্পে লাগিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট অপেক্ষা করুন যাতে এটি ভালোভাবে বসে যায়।
- ধোয়া: সময় হয়ে গেলে একটি মৃদু বা মাইল্ড শ্যাম্পু (Mild shampoo) দিয়ে চুল ভালো করে ধুয়ে ফেলুন
কতদিন ব্যবহার করবেন: ভালো ফলাফলের জন্য সপ্তাহে ২ দিন করে নিয়মিত এই প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। এক মাস ব্যবহার করলে লক্ষণীয় উন্নতি পাওয়া যায়।
খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক উপায় ব্যবহারে সতর্কতা
প্রাকৃতিক উপাদান হলেও সবার ত্বকে তা নিরাপদ নয়। তাই নতুন কোনো উপাদান মাথায় লাগানোর আগে হাতের অল্প লাগিয়ে দেখতে পারেন। জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব বা চুলকানি দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করে দিন। একসঙ্গে অনেকগুলো উপাদান ব্যবহার না করে একবারে একটি করে চেষ্টা করুন, যাতে কোনটি উপকারী বা ক্ষতিকর তা বোঝা যায়।
আপেল সাইডার ভিনেগার ও টি ট্রি অয়েলের মতো শক্তিশালী উপাদান কখনোই সরাসরি মাথার ত্বকে লাগাবেন না, সবসময় পানি মিশিয়ে ব্যবহার করুন। মাথার ত্বকে ক্ষত, কাটা বা তীব্র প্রদাহ থাকলে এসব উপাদান ব্যবহার করা ঠিক নয়। তৈলাক্ত ত্বকে বা তীব্র খুশকিতে নারকেল তেলের মতো তেল লাগালে সমস্যা বাড়তে পারে আর তেল লাগালে সারা রাত না রেখে নির্দিষ্ট সময় পর শ্যাম্পু দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন।
গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী মা, শিশু এবং ত্বকের অ্যালার্জি বা অন্য কোনো ত্বকের সমস্যা থাকলে ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। প্রাকৃতিক উপায়ের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা সীমিত, তাই অন্তত ২ থেকে ৪ সপ্তাহ নিয়মিত ব্যবহার করে ফলাফল দেখুন। এরপরও খুশকি না কমলে বা মাথার ত্বক লালচে হয়ে চুলকানি বাড়লে স্কিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
মাথায় খুশকি হলে কি চুল পড়তে পারে?
মাথার ত্বকে খুশকির কারণে অতিরিক্ত চুলকানি ও অস্বস্তি হলে অনেকে বারবার মাথা আঁচড়ান বা নখ দিয়ে ঘষেন। এতে চুল ভেঙে যেতে পারে এবং মাথার ত্বকে ক্ষত তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া খুশকির সঙ্গে প্রদাহ থাকলে চুল পড়ার সমস্যা আরও লক্ষণীয় হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, চুল পড়ার পেছনে বংশগত কারণ, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপ বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে। তাই চুল পড়লেই এর কারণ খুশকি, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
খুশকি দূর করতে যে অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলবেন
খুশকি দূর করতে এবং মাথার ত্বক সুস্থ রাখতে কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস অবশ্যই এড়িয়ে চলা উচিত।
- মাথা চুলকানো: খুশকি হলে মাথা চুলকানোর প্রবণতা বাড়ে কিন্তু চুলকানি হলেও নখ দিয়ে কড়াভাবে মাথা চুলকাবেন না। এতে স্ক্যাল্পে ক্ষত হতে পারে এবং সংক্রমণ বা চুল পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- খুব গরম পানিতে গোসল: গোসলের সময় মাথায় অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এটি মাথার ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক করে তোলে, যা খুশকি বাড়িয়ে দেয়। তাই সবসময় কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।
- চুল কম ধোয়া বা অনিয়মিত পরিষ্কার: নিয়মিত চুল ও স্ক্যাল্প পরিষ্কার করা কমিয়ে দিলে স্ক্যাল্পে তেল, ময়লা ও মৃত কোষের আস্তরণ জমে সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। তাই সপ্তাহে অন্তত ২ থেকে ৩ দিন উপযুক্ত শ্যাম্পু দিয়ে মাথা পরিষ্কার করতে হবে।
- চুল ও মাথা ভিজা রাখা বা দীর্ঘক্ষণ তেল জমিয়ে রাখা: চুলে অতিরিক্ত সময় তেল বা ভেজা ভাব জমিয়ে রাখলে ছত্রাকের প্রকোপ বাড়তে পারে।
- অতিরিক্ত তাপের ব্যবহার: হেয়ার ড্রায়ার বা স্ট্রেইটনারের অতিরিক্ত হিট স্ক্যাল্পের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়।
- মানসিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং অস্বাস্থ্যকর বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার গ্রহণ খুশকি বাড়িয়ে দেয়।
পরিশেষ
খুশকি মাথার ত্বকের একটি সাধারণ সমস্যা, যা সঠিক যত্ন ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। খুশকি দূর করার ঘরোয়া ও প্রাকৃতিক উপায় অনুসরণ করার পাশাপাশি চুল ও মাথার ত্বকের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু নির্বাচন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন পরিচর্যার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। তবে প্রাকৃতিক উপাদান সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। তাই খুশকি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, মাথার ত্বকে অতিরিক্ত চুলকানি, লালচে ভাব বা প্রদাহ দেখা দিলে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সঠিক পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে মাথার ত্বক সুস্থ রাখা এবং খুশকির অস্বস্তি কমানো সম্ভব।
খুশকি দূর করার ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে FAQ
মাথায় অতিরিক্ত খুশকি কেন হয়?
মাথায় অতিরিক্ত খুশকি হওয়ার পেছনে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল, ম্যালাসেজিয়া (Malassezia) নামের এক ধরনের ছত্রাক, শুষ্ক ত্বক বা সেবোরিক ডার্মাটাইটিসের মতো কারণে হতে পারে।
খুশকি থাকলে কোন তেল ব্যবহার করা উচিত?
খুশকি থাকলে মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করাই ভালো। তেল ব্যবহারে খুশকি বেড়ে গেলে তা বন্ধ করুন। শুষ্ক চুলের আগায় অল্প তেল ব্যবহার করা যেতে পারে যেমন- টি ট্রি অয়েল, নারকেল তেল, তুলসী বা পুদিনা তেল প্রভৃতি।
লেবু দিয়ে কি খুশকি দূর করা যায়?
হ্যাঁ, লেবু দিয়ে চুল থেকে খুশকি দূর করা যায়, কারণ লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড ও অ্যান্টি-ফাঙ্গাল উপাদান মাথার ত্বকের ছত্রাক সংক্রমণ কমাতে এবং মৃত কোষ সরাতে সাহায্য করে। তবে সরাসরি লেবুর রস ত্বকে লাগানো ঠিক নয়, এতে স্ক্যাল্পে জ্বালা বা চুলকানি হতে পারে।
প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে কি খুশকি কমে?
হ্যাঁ, অ্যান্টি-ড্যান্ড্রফ বা খুশকিনাশক শ্যাম্পু দিয়ে প্রতিদিন বা নিয়মিত শ্যাম্পু করলে খুশকি কমে, তবে এটি নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের শ্যাম্পু ব্যবহার করছেন এবং আপনার স্ক্যাল্পের ওপর। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিদিন ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না।
খুশকি দূর করার জন্য কোন শ্যাম্পু ভালো?
খুশকি কমাতে কেটোকোনাজল, সেলেনিয়াম সালফাইড বা জিঙ্ক পাইরিথিয়নযুক্ত মেডিকেটেড শ্যাম্পু কার্যকর হতে পারে। খুশকির ধরন ও ত্বকের অবস্থা অনুযায়ী উপযুক্ত শ্যাম্পু বেছে নেওয়া ভালো।
খুশকি দূর করার জন্য কোন ঔষধ ব্যবহার করা যায়?
খুশকি দূর করতে কেটোকোনাজল, সেলেনিয়াম সালফাইড বা জিঙ্ক পাইরিথিয়নযুক্ত মেডিকেটেড শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে খুশকি বেশি হলে বা দীর্ঘদিন না কমলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।




